
প্রযুক্তি ডেস্ক
একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি। কয়েক বছর আগেও যা কল্পবিজ্ঞানের বিষয় ছিল, তা এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব রূপ নিয়েছে। যোগাযোগ, চিকিৎসা, শিক্ষা থেকে শুরু করে বৈশ্বিক অর্থনীতির চাকা—সবকিছুতেই এখন রাজত্ব করছে কম্পিউটার অ্যালগরিদম ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি। তবে এই দ্রুতগতির উন্নয়ন মানবজাতির সামনে যেমন অপার সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, তেমনি তৈরি করেছে জটিল নৈতিক ও সামাজিক সংকট।
তথ্যপ্রযুক্তি ও এআই মানুষের কাজকে আগের চেয়ে শতগুণ দ্রুত ও নির্ভুল করে তুলেছে। চিকিৎসাক্ষেত্রে জটিল রোগ নির্ণয় ও নতুন ওষুধ উদ্ভাবনে এআই গবেষকদের যুগান্তকারী সহায়তা দিচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিটি শিক্ষার্থীর মেধা অনুযায়ী ব্যক্তিগতকৃত শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সহজ হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস দেওয়া, স্বয়ংক্রিয় গ্রাহক সেবা প্রদান এবং কারখানায় রোবটের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার ফলে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বেড়ে গেছে। মানুষের সময় বাঁচিয়ে সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এই প্রযুক্তি।
মুদ্রার উল্টো পিঠে প্রযুক্তিবিপ্লবের সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসছে শ্রমবাজারে। তথ্যপ্রযুক্তি ও জেনারেটিভ এআইয়ের প্রসারের কারণে কল সেন্টার, সাধারণ লেখালেখি, গ্রাফিক্স ডিজাইন ও কোডিংসহ বহু প্রচলিত পেশায় জনবলের চাহিদা কমছে। বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে না পারলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেকারত্ব ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত সুবিধার অসম বণ্টনের কারণে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে।
আধুনিক প্রযুক্তির অতিমাত্রিক ব্যবহারের ফলে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত ডেটা সংগ্রহ করে বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করছে। এছাড়া ডিপফেক ছবি-ভিডিও, ভুয়া সংবাদ তৈরি এবং আর্থিক জালিয়াতিতে এআইয়ের ব্যবহার সমাজের নৈতিক ভিত্তি ও স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সাইবার হামলার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ-যোগাযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অচল করে দেওয়ার আশঙ্কাও প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
প্রযুক্তি কোনোভাবেই পুরোপুরি ভালো বা খারাপ নয়, বরং এর ভালো-মন্দ নির্ভর করে মানুষের ব্যবহারের ওপর। তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এর ঝুঁকি কমাতে আন্তর্জাতিকভাবে কঠোর আইন প্রণয়ন ও নীতিমালার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার এনে নতুন প্রজন্মকে এআই ব্যবহারের উপযুক্ত দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করাই হবে ভবিষ্যৎ বিশ্বের প্রধান চাবিকাঠি।