
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
চাঁদের বুকে মহাকাশযান অবতরণের ইতিহাসে সূচনা হয়েছে এক নতুন অধ্যায়ের। ১৯৫৯ সালে মানবসৃষ্ট প্রথম কোনো বস্তুর চাঁদে আছড়ে পড়ার মাধ্যমে যে চন্দ্রাভিযানের সূচনা হয়েছিল, ২০২৫ সালে এসে তা সরকারি গণ্ডি পেরিয়ে সফল বাণিজ্যিক রূপ লাভ করেছে। মহাকাশ গবেষণায় এখন সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৫৯ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘লুনা ২’ মহাকাশযানটি প্রথমবারের মতো চাঁদের বুকে আছড়ে পড়ে (হার্ড ল্যান্ডিং), যা ছিল মহাকাশ গবেষণার এক বড় মাইলফলক। এরপর ১৯৬৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নেরই ‘লুনা ৯’ প্রথমবারের মতো চাঁদের বুকে সফলভাবে পালকের মতো অবতরণ (সফট ল্যান্ডিং) করে এবং সেখান থেকে প্রথমবারের মতো ছবি পাঠাতে সক্ষম হয়।
একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের ‘সার্ভেয়র ১’ চাঁদে সফলভাবে অবতরণ করে মানুষের যাওয়ার পথ সুগম করে। এরপর আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ১৯৬৯ সালে নাসার অ্যাপোলো ১১ মিশনে নীল আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদের বুকে পা রাখেন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত অ্যাপোলো মিশনগুলোর মাধ্যমে মোট ছয়বার চাঁদে মানুষের সফল অবতরণ ঘটে, যার সবশেষটি ছিল অ্যাপোলো ১৭।
দীর্ঘ বিরতির পর একবিংশ শতাব্দীতে চাঁদে সফট ল্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে নতুন করে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ২০১৩ সালে চীনের ‘চাং'ই ৩’ এবং ২০১৯ সালে চাঁদের অদেখা অংশে ‘চাং'ই ৪’ সফলভাবে অবতরণ করে চমক দেখায়। এরপর ২০২৩ সালের আগস্টে ভারতের ‘চন্দ্রযান-৩’ চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে সফলভাবে অবতরণ করে দেশটিকে সফট ল্যান্ডিংয়ের তালিকায় চতুর্থ স্থানে নিয়ে যায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জাপানের ‘স্লিম’ ল্যান্ডার পঞ্চম দেশ হিসেবে এই তালিকায় যুক্ত হয়। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওডিসিউস’ চাঁদে সফলভাবে অবতরণ করে, যা ছিল মূলত চাঁদের বুকে অবতরণ করা প্রথম কোনো বেসরকারি মহাকাশযান।
তবে বাণিজ্যিক চন্দ্রাভিযানের পালে সবচেয়ে বড় হাওয়া লাগে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে। ফায়ারফ্লাই অ্যারোস্পেসের ‘ব্লু ঘোস্ট মিশন ১’ চাঁদের মারে ক্রিসিয়ামের মনস ল্যাটরিলের কাছে সফলভাবে অবতরণ করে, যা মহাকাশের ইতিহাসে প্রথম সম্পূর্ণ সফল বাণিজ্যিক চন্দ্রাবতরণ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। নাসার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া এই ল্যান্ডারটি চাঁদের বুকে ১৪ দিন ধরে সফলভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। নাসার কমার্শিয়াল লুনার পে-লোড সার্ভিসেস (সিএলপিএস) উদ্যোগের অংশ হিসেবে পরিচালিত এই মিশনটি প্রমাণ করেছে যে, বেসরকারি সংস্থাগুলোও এখন নির্ভরযোগ্য লুনার অপারেশন পরিচালনায় সক্ষম। এটি নাসার ভবিষ্যৎ ‘আর্তেমিস’ প্রোগ্রামের জন্যও একটি বড় মাইলফলক।
চন্দ্রাভিযানের এই বিবর্তন প্রমাণ করে যে, মহাকাশ গবেষণা এখন আর কেবল রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর একচেটিয়া বিষয় নয়। চাঁদের ভূতত্ত্ব, ভূপৃষ্ঠের অবস্থা এবং সম্ভাব্য সম্পদের সন্ধানে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর এই সফল অংশগ্রহণ মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। আগামী দিনে চাঁদে মানুষের স্থায়ী বসতি স্থাপনের যে স্বপ্ন বিজ্ঞানীরা দেখছেন, এই বাণিজ্যিক সাফল্য সেই যাত্রাকে আরও একধাপ এগিয়ে দিল।