ডেস্ক রিপোর্ট
ঢাকা-কলকাতা রুটেচলাচলকারী আন্তদেশীয় ট্রেন ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’ পদ্মা সেতু ও বেনাপোল হয়ে পরিচালনার বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে যাত্রীদের প্রায় তিন ঘণ্টা সময় বাঁচার পাশাপাশি ভাড়া কমতে পারে অন্তত এক হাজার টাকা।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, বর্তমানে যমুনা সেতু ও দর্শনা হয়ে কলকাতা যেতে ট্রেনটির নির্ধারিত সময় ৭ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট হলেও যানজট ও আনুষঙ্গিক পরিচালনাগত জটিলতায় ৯-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যায়। তবে পদ্মা সেতু দিয়ে নতুন রুটে ট্রেনটি চললে মাত্র ৬ ঘণ্টায় ঢাকা থেকে কলকাতা পৌঁছানো সম্ভব। গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ৩৮তম বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসরকার রেলওয়ে বৈঠকে (আইজিআরএম) বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়।

নতুন রুট ও সম্ভাবনার প্রেক্ষাপট ২০০৮ সালের পয়লা বৈশাখে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু-ঈশ্বরদী-দর্শনা হয়ে কলকাতা পর্যন্ত ৩৯২ কিলোমিটার পথে মৈত্রী এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরু হয়। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তার কারণে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই থেকে ট্রেনটির চলাচল বন্ধ রয়েছে। এদিকে, ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-যশোর-বেনাপোল রুটে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে। বর্তমানে ‘রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস’ এই পথে বেনাপোল পৌঁছাতে মাত্র ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট সময় নিচ্ছে। এই সফলতার ওপর ভিত্তি করেই মৈত্রী এক্সপ্রেসের রুট পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে এসেছে।
যাত্রীদের স্বস্তি ও পরিসংখ্যান
মৈত্রী এক্সপ্রেস মূলত চিকিৎসাপ্রার্থী, বয়স্ক নাগরিক, শিশুসহ পরিবার, ব্যবসায়ী ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া যাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। আকাশপথের চেয়ে সাশ্রয়ী হওয়ায় সাধারণ যাত্রীরা এই ট্রেনটি বেশি ব্যবহার করেন। রেলওয়ের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত ট্রেনটিতে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৬০ জন যাত্রী ভ্রমণ করেছেন, যার ৯৫ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি। সাধারণ সময়ে এর আসন পূর্ণ থাকার হার ৮০-৮৫ শতাংশ হলেও ঈদ বা পূজার মতো উৎসবে তা ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। রুটটি বেনাপোল দিয়ে হলে বিপুলসংখ্যক এই যাত্রীর ভোগান্তি ও যাতায়াত খরচ—দুটোই উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও পরবর্তী পদক্ষেপপদ্মা সেতু হয়ে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালুর বিষয়ে ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডের অ্যাডিশনাল মেম্বার (ট্রাফিক) দীপক কুমার ঝা তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান জানান, ভারত থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব এলে বাংলাদেশ সরকার তা বিবেচনা করবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউল হকও একই মত পোষণ করে বলেন, এ ক্ষেত্রে মূল উদ্যোগ ভারতীয় পক্ষকেই নিতে হবে। আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রস্তাব এবং সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদনের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে রুট পরিবর্তনের এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন পথে দূরত্ব কমায় জ্বালানি ও সময় উভয়ই বাঁচবে, ফলে যাত্রীভাড়াও কমানো সম্ভব হবে। জনস্বার্থে বিষয়টি দ্রুত বিবেচনার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। প্রস্তাবটি বাস্তবে রূপ দিতে হলে রেলওয়ের সক্ষমতা, ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা, সময়সূচি এবং ভাড়ার মতো কারিগরি বিষয়গুলো চূড়ান্ত করতে হবে।